বিজয় সম্ভব করোনা যুদ্ধে

বিজয় সম্ভব করোনা যুদ্ধে

প্রথমে জানাচ্ছি মহান স্বধীনতা দিবসের আন্তরিক অভিনন্দন।  মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নভেল করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেছেন। সফলভাবে যুদ্ধ চালাতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন যুদ্ধ চালানোর উপযুক্ত সংগঠন। শান্তি কালীন সময়ের মন্ত্রণালয়/ প্রতিষ্ঠান দিয়ে তীব্র গতির করোনা বাগে আসবে না। নিউইয়র্কের বর্তমান মেয়র এন্ড্রু  কুয়োমোর ভাষায় - "করোনা চলছে বুলেটের গতিতে।" এ যুদ্ধে জয়লাভ করতে হলে আমাদের করোনা প্রতিরোধ কাজ-কর্মে  এমনি গতি সন্চার করতে হবে। সে জন্য আমার পরামর্শঃ জাতীয় "করোনা নির্মূল কাউন্সিল" (ক নি ক) ও  জেলায় জেলায় টাস্কফোর্স (ক নি ক / ট) গঠন।  এদেরকে চলতে হবে বুলেটের গতিতে, ওয়ার ফুটিংএ, সবাইকে নিয়ে। প্রয়োজন হতে পারে সুদক্ষ সামরিক নেতৃত্ব। এরাই হবেন নভেল করোনা যুদ্ধের দক্ষ নীতি নির্ধারক, স্ট্রাটেজিস্ট, পরিচালক ও করোনা যোদ্ধা। সরকার দিক-নির্দেশনা দিবেন,  সরবরাহ করবেন সকল রশদ/সরন্জাম এবং চালাবেন জোড়ালো কুটনৈতিক তৎপরতা।
নীচে রইল কিছু বিস্তারিত বর্ণনা।
আমার কথা কতটুকু দেশের কাজে লাগবে জানিনা৷ সম্ভাবনা হয়ত ক্ষীন। বিবেকের তাড়নায় ভাবছি, অবশ্যই বলা দরকার যা উপলব্ধি করছি, কেউ পছন্দ করুক বা না করুক। নীরব থাকার সময় এটা নয়। সময়টা আসলেই খুবই অনিশ্চিত, খুবই খারাপ।  কত যে ক্ষতি হবে, কেউ জানে না। আতংক ছড়ানো নয়, সতর্ক করাই আমার লক্ষ্য। সকল কর্মতৎপরতা জোড়ালো করতে বলাই আমার উদ্দেশ্য। যে ভাবে সব চলছে, সে ভাবে চললে বিপর্যয়ের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। আমাদের ব্যাক্তি, সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শৃংখলার মান খুব গর্ব করার মত নয়। আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ও আইন মেনে চলার স্বাভাবিক প্রবনতাও নাই। দ্রুতগামী করোনা যুদ্ধে জয়লাভের জন্য এ সবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সব কিছু মাথায় রেখেই আমার ধারণা গুলো ব্যাক্ত করছি। সর্বাত্মক করোনা যুদ্ধের জন্য - টোটাল ন্যাশনাল ওয়ার এগেইনস্ট করোনা ভাইরাস-১৯ এর কাজে লাগতেও পারে আমার দুই- একটা কথা। তাই ঢিল ছুড়ছি অন্ধকারে, অনেক কথা আছে, কিন্তু বলছি খুবই সংক্ষিপ্ত ভাবেঃ
 ১। প্রথম কথা হল টোটাল ন্যাশনাল মোবিলাইজেশনঃ ছাত্র-যুব সমাজকে ডাকুন।অবসর প্রাপ্তদেরও ডাকুন। সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজকে ডাকুন। মালিক- শ্রমিক সবাইকে এ যুদ্ধে সামিল করতে হবে; রাজনৈতিক দ্বিধা-দ্বন্দ-সংকোচ আপাততঃ শিকায় তুলে রাখতে হবে। । এখন মোটেই দলকানা থাকা যাবে না। এ যুদ্ধ অবশ্যই সকলের যুদ্ধ, ১৬/১৭ কোটি মানুষের এক বিশাল ও স্পর্শকাতর জনযুদ্ধ, - করোনা নামের এক অজানা ও ভয়ানক শত্রুর বিরুদ্ধে, প্রতেক নাগরিক এ শত্রুর টারগেট।
২। যে ভাবেই হোক, বেগম জিয়া আপাতত মুক্ত। সরকারকে ধন্যবাদ। এখন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, অন্যান্য দল, এন জি ও ও সিভিল সমাজের নেতৃত্বদের  নিয়ে মাঝে মাঝে, প্রয়োজন অনুযায়ি সরকার / প্রধানমন্ত্রী নীতি-নির্ধারণী পরামর্শ সভা ডাকতে পারেন। করোনা নির্মূলে সময়ে সময়ে সমস্যা বিশ্লেষন, সমাধান-কৌশল নির্ধারণ, বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষন-অনুবীক্ষন, নীতি-কৌশল নবায়ন, পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয়ে এ ধরনের উদ্দ্যোগ জাতীয় ঐক সৃষ্টিতে গঠনমুলক ভূমিকা রাখবে। তাই আবার বলবো, সবার আংশ গ্রহন দরকার, সে রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরী করা দরকার। এ দুর্যোগে কারো দলকানা থাকা চলবে না। কঠিন এ সময় পাড়ি দিতে, আসলেই যুদ্ধকালীন সময়ের মতো, জাতীয় ঐক্যবদ্ধ  প্রয়াস একান্ত দরকার। আশাকরি বেগম জিয়া বিষয়টিকে গুরুত্ব দিবেন এবং তার দলে এ বিষয়ে দ্রুত ঐক্যমত তৈরী করতে তৎপর হবেন, সরকারকে এ যুদ্ধে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন।
৩। বাস্তব সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রস্তুতের জন্য আমার প্রস্তাবঃ একটি জাতীয়/সর্বদলীয় "করোনা নির্মূল কাউন্সিল ও টাস্কফোর্স" (ক নি ক/ ট) গঠন করুন। যে নামই দিন না কেন, সকল পর্যায়ে বেশ ক'জন সেনা কর্মকর্তাও রাখুন এ কাউন্সিলে ও টাস্কফোর্সে। এঁদেরকে দিয়ে ২৪ঘন্টা/৭ দিনই সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে প্রোআ্যকটিভ ভাবে কাজ করাতে হবে, সঠিক নীতি-কৌশল নিতে হবে, করোনার আগে চলতে হবে, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সব বিভাগে ও জেলায় শাখা গঠন করতে হবে। শুধু প্রশাসন একা সব পারবে না। জাতীয় কাউন্সিলে  পেশাগত ভাবে দুর্নীতি মুক্ত, নৈতিক চরিত্রে বলিষ্ঠ  ও সুদক্ষদের নিয়ে স্টাফিং করতে হবে, সাজ- সরন্জাম, যানবাহন ও প্রয়োজনীয় বাজেট দিতে হবে।
৪। ফেসবুকে একটা লম্বা  পোস্টে  দেখলাম - করোনার জন্য নির্ধারিত কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের অবস্হা করুণ। ভিতরে/বাইরে গাঁদাগাঁদি অবস্হা, সর্বত্র হাঁচি/কাশি/থুতু। ডাঃ/নার্সদের পিপিই নেই। রোগী/অভিভাবক ফিরে যাচ্ছেন। নির্ধারিত অন্যান্য হাসপাতাগুলোরও খোঁজ রাখা দরকার। IEDCRএর আন্তরিকতা/দক্ষতা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলছেন। মানতেই হবে IEDCR  ভীষন চাপে আছেন। তবে অবহেলার অভিযোগ থাকলে তার দ্রুত ও গোপন তদন্ত এবং বিহিত করা দরকার। সবাই জানি যে নৈতিক মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়/অধঃপতন সবখানেই / সেকটারেই আছে, ব্যাপক ভাবে।
৫। করোনা পরীক্ষা হচ্ছে ঢাকায় মাত্র ৫/৬ টা হাসপাতালে। বাইরে ত নেই। পরীক্ষা করাই হলো করোনা যুদ্ধের ফ্রন্ট লাইন। কিন্তু কিট বা ল্যাব সুবিধার ঘাটতিগুলো দ্রুত দূর করতে না পারলে যুদ্ধ চলবে কি করে? ঢাকাতে শুধু নয়,বড় সব জেলাতেই ব্যবস্হা করতে হবে। পি পি ই তে আছে ১০ রকমের জিনিষ - গাউন, হেড/ফেস কাভার, গগলস, গ্লাভস ইত্যদি। এসবের সাপ্লাই কম, ১ মাসের আছে কি না সন্দেহ? সুতরাং বহির্দেশীয় সহায়তার / কেনাকাটার উদ্যোগ দরকার। সময় কম।
৬। খবরে প্রকাশ যে ইতালিকে চীন  প্রচুর সহায়তা দিচ্ছে। আমরাও কি চাইতে পারিনা? ইতালির প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে এ সহায়তে তারা পেয়েছন। আমাদের অনেক দূর্বলতা আছে, সহায়তারও বিশেষ প্রয়োজন আছে। করোনা নিয়ন্ত্রণে সবকিছুই চীনের অতিরিক্ত আছে। করোনাও নিয়ন্ত্রণে আছে। আরো শুনলাম কিউবা অনেক দক্ষ ডাঃ/নার্স ইউরোপে পাঠাচ্ছে। করোনা নিয়ন্ত্রনহীন ভাবে ছড়িয়ে পড়ার আগেই এ ধরনের আন্তর্জাতিকল সহায়তা খোঁজা করা দরকার।
৭। সেনা বাহিনী বলছে - তারা ৩ ঘন্টায় ৫০ বেডের ৫টি ফিল্ড হসপিটাল চালু করতে পারবেন। দরকার সব জেলাতেই ১টা; আপাততঃ সব বিভাগে হোক ১টা বা ২ টা। সেনা বাহিনীর এ সামর্থ দ্রুত বাড়ানো প্রয়োজন। বিদেশী সহায়তা ছাড়া তা হবে না। চীন ১০ দিনে ১০০০ বেড করতে পারে। তারা রাজি থাকলে সব জেলার খোলা মাঠে স্টেডিয়ামে ৫০/১০০ বেডের ফিল্ড হাসপাতাল করা ও চালানো যায়। কিছুদিনের জন্য দক্ষ জনবল এসে আমাদের ক্র্যাশ-ট্রনিংও  দিতে পারে। আর্মী মেডিক্যাল কোরের ও অন্যান্য রেজিমেন্টের প্রচুর মেডিক্যাল জনবল আছে। ৭০/৮০ হাজার গ্রামের জন্য  ৫/৬ হাজার ইউনিয়নেে ১০/১২ হাজার পল্লী চিকিৎসক আছে। পর্যায়ক্রমে সবাইকে ক্র্যাশ প্রোগ্রমে আনা যায়।
৮। চীন করোনা নিয়ন্ত্রণে এনেছে। কি ভাবে - সে শিক্ষাও নেয়া যায়। তাদের অতিরিক্ত অনেক সাজ-সরন্জাম থাকতেও পারে। চেস্টা করতে অসুবিধা কোথায়? চীনা সহযোগিতার জন্য প্রয়োজন জোড়দার কুটনৈতিক তৎপরতা। বেজিংএ আমাদের দূতাবাস প্রয়োজনীয় তথ্য যোগার করতে পারে।
৯। আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা জি-২০ দেশগুলোকে সতর্ক করেছেন যে করোনা ও অন্যান্য কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি চরম বিপর্যয়ে পড়বে। গরীব অর্থনীতির দেশ ও খেটে খাওয়া মানুষের দুর্ভোগ শুরু হয়ে গেছে। সংস্হাটি এখন ১ লক্ষ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দিতে প্রস্তুত। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা নিম্ন আয়ের দেশগুলো অগ্রাধিকার পেতে পারে। পরবর্তিতে ঋণ মওকুফও হতে পারে। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক সংকটের কথা সবাই বলছে। শিল্প-কলকারখানার পূঁজি সংকট, ব্যাংকে লিকুইডিটির অভাব, বিনিয়োগ শুন্যতা এবং শিক্ষা-স্ব্যাস্হ-সামাজিক নিরাপত্তার বাজেট নিয়ে টানাটানি ত আছেই। করোনা ও রোহিংগা তার উপর মারাত্মক বাড়তি চাপ। আমরা জানি যে আইএমএফ ভাল লেন্ডার নয়। তবে ঋণ মওকুফের একটা ভাল সুযোগ আছে। বিশ্ব ব্যাংক, এডিবি, এআইআইবি, চীন সরকারের সাথে কথা শুরু হতে পারে। সমস্যা ত থাকতেই পারে। সবাই যখন করোনা বিপদে, কাজটি কঠিন হবে। কিন্তু আমাদেরও প্রয়োজন জরুরী। করোনা যুদ্ধ মুখে মুখে নয়, বাস্তবে সফল করতে হলে যুদ্ধের খরচ দ্রুত যোগার করতেই হবে। ভালো নেগোশিয়েটিং স্কিল প্রয়োগে অনুদান/ঋণ সর্ত সহজ হতে পারে।  বিষয়গুলোর ভাল মন্দ বিবেচনা করে সময় থাকতে জোড়ালো  কুটনৈতিক তৎপরতা এখনি শুরু করা উচিত।
১০। করোনার প্রসার ঠেকাতে লম্বা ছুটি, ফলে মানুষের বাড়ী যাবার প্রবণতা, পরিবহনে হুমড়ি খেয়ে পড়ার সম্ভাবনা কারো মাথায় কি আসলোনা? আগে কি এ সব আমরা দেখিনি। এর ফলে করোনা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বাড়লো না কমলো! এ জন্য বলি - একটা দুটা নয়, বেশ কিছু পারদর্শী মাথা কাজে লাগানো দরকার। ক নি ক / ট  থাকলে কেউ না কেউ পরামর্শ দিতো যে ১/২ দিন আগেই সড়ক, নৌ ও রেল - সকল পরিবহন বন্ধ করে দিন। তারপর বলা যেত - আগামিকাল থেকে অফিসে আসতে হবে না। কোন গাড়ী চলবে না। বাড়িতে বসে থাকবেন। বাইরে বেড় হওয়া নিষেধ, গ্রামের বাড়ীতে যেতে পারবেন না। ১০ দিন কোন ছুটি নয়। করোনা কারফিউ দেয়া হল। রাস্তায় সেনা সদস্যরা থাকবেন। ২ জনের বেশী একসাথে বেড়োলেই ১০/১৫ দিন শ্রীঘড়ে থাকতে হবে। আপনাদের করোনা থেকে বাঁচানোর জন্যই এসব কড়াকড়ি, ইত্যাদি।
শেষে আবার বলবো যে বাড়ী যেতে সবার হুমরী খেয়ে পরার ঘটনা এবং জানুয়ারী / ফেব্রুয়ারিতেই প্রস্তুতি শুরু না করা প্রমান করে যে - আসলেই জাতীয় "করোনা নির্মূল কাউন্সিল" ও বিভাগে/জেলায় টাস্কফোর্স গঠন খুবই দরকার। তাছাড়া সংশ্লিষ্ট ৭/৮ জন মন্ত্রীর উপর মানুষ আস্হা হারিয়েছে- সোশ্যাল মিডিয়া তাই বলে। মনে রাখা দরকার আগামী দিনগুলোতেও তোগলকি কান্ড ঘটে যেতে পারে।
তাই দ্রুত "ক নি ক / ট" গঠন ও সুনির্দিষ্ট দায়-দায়ীত্ব নির্ধারণ প্রয়োজন। দক্ষ, দায়ীত্ববান, টেকনোক্র্যাট, অরাজনৈতিক ব্যক্তি - এমনকি সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত সামরিক/বেসামরিক ডাঃ/নার্স ও কর্মকর্তাদের পুনঃনিয়োগ করা যায়, যুদ্ধ কালীন সময়ে যে ভাবে করা হয়। বিভাগে জিওসিদের সম্পৃক্ত করা যায়। সিভিল-মিলিটারি সম্পর্ক ঠিক রেখে  এ ভাবেই সম্ভব হতে পারে, ওয়ার ফুটিংএ করোনা যুদ্ধে আমাদের বিজয়। এবং জয়লাভ আমাদের করতেই হবে।
আমসাআ আমিন
মে জেনারেল ও রাষ্ট্রদূত